স্টাফ রিপোর্টার : মতলব দক্ষিণ উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহ কর্মসূচিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রকৃত কৃষকদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক কৃষকের ধান খাদ্য গুদামে নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, যেসব কৃষকের ধান গ্রহণ করা হয়েছে, তাদের কাছ থেকেও প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযোগ পেলে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপ্রাপ্ত প্রকৃত কৃষকরা প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন ধান সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রির সুযোগ পান। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, বাস্তবে এই সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষক ফারুক আহমদ জানান, তিনি কৃষি কার্ডধারী এবং উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। খাদ্য গুদাম থেকে ধান সরবরাহের জন্য বস্তাও পেয়েছিলেন। এরপরও তার ধান গ্রহণ করা হয়নি। একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন তার ভাই মহসিনও।
ফারুক আহমদের অভিযোগ, যেসব কৃষকের ধান গ্রহণ করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। তিনি নিজেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অর্থ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও কয়েকদিন ঘুরানোর পর শেষ পর্যন্ত তাকে জানানো হয়, চলতি মৌসুমে আর ধান নেওয়া হবে না।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কৃষক সুদর্শন চন্দ্র দাবি করেন, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে তাকে ‘অফিস খরচ’ নামে ৭ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তার ভাষ্য, অন্য অনেক কৃষকের কাছ থেকেও একইভাবে আরও বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য সরাসরি সাক্ষাতে জানানো সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আরেক কৃষক মোজাম্মেল সরকার বলেন, সরকারি ভ্যাট, বস্তা ও শ্রমিক খরচের কথা বলে প্রতি বস্তা ধানের জন্য ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। তিনি ৬৫ বস্তা ধান সরবরাহ করায় তার কাছ থেকে মোট ৬ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষকের অভিযোগ, খাদ্য গুদামের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের মাধ্যমেই ধান সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রত্যয়নপত্র থাকা প্রকৃত কৃষকদের অনেকেই সরকারি দামে ধান বিক্রি করতে না পেরে খোলা বাজারে কম দামে বিক্রি করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এ বিষয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, চলতি মৌসুমে খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির জন্য প্রায় ২৫০ জন আগ্রহী কৃষককে কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রত্যয়নপ্রাপ্ত কৃষকদের ধান প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষ ক্রয় করবে। কৃষি অফিসের প্রত্যয়ন ছাড়া ধান সরবরাহের সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক খালেদা আক্তার বলেন, ৭৫ মণ ধান বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ভ্যাট বাবদ ৫৪০ টাকা ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কোনো বিধান নেই। কেউ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) একরামুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ৩৬ টাকা কেজি দরে ৩০০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। তার দাবি, সরকার নির্ধারিত ভ্যাট ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নিয়ে থাকলে সে বিষয়ে তার জানা নেই। লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এ সময় সাংবাদিকরা অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম আহমেদ বলেন, কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপ্রাপ্ত প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোনো কৃষক লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় সরাসরি ধান ও চাল সংগ্রহ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত ১০০ জন কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে মোট ৩০০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

