ফরিদগঞ্জে এলার্জির ইনজেকশনে শিশুদের হাত ক্ষতিগ্রস্তের অভিযোগ

ফরিদগঞ্জে এলার্জির ইনজেকশনে শিশুদের হাত ক্ষতিগ্রস্তের অভিযোগ

উপজেলা সংবাদ ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্লাইড

ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি : ফরিদগঞ্জ উপজেলায় এলার্জির চিকিৎসার নামে দেওয়া ইনজেকশনের পর কয়েকজন শিশু ও এক গৃহবধূর হাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে।

উপজেলার গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের ফকির বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একই এলাকার বাসিন্দা মো. রিয়াজুল হক। ভুক্তভোগীদের দাবি, তিনি নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখলেও স্বীকৃত কোনো চিকিৎসা ডিগ্রি তার নেই।

অভিযোগ অনুযায়ী, এলার্জির চিকিৎসা নিতে গিয়ে ইনজেকশন নেওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই আক্রান্তদের হাতে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ইনজেকশন প্রয়োগের স্থান শুকিয়ে যায়, মাংসপেশি ক্ষয় হতে থাকে এবং হাত দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, মো. রিয়াজুল হক দীর্ঘদিন ঢাকার এক চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন। স্থানীয় অনেকেই তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনে করে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতেন। বিশেষ করে এলার্জির চিকিৎসার জন্য তার কাছে রোগীদের উপস্থিতি ছিল বেশি।

এ ঘটনায় গুরুতর শারীরিক জটিলতায় পড়েছেন গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের শ্রীকালিয়া গ্রামের গৃহবধূ রোকসানা বেগম, তার ১৮ মাস বয়সী ছেলে আব্দুল আহাদ, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশ্রাফুল ইসলাম, মাদ্রাসাছাত্র মো. ইয়াছিনসহ আরও কয়েকজন।

রোকসানা বেগম জানান, প্রায় তিন মাস আগে তিনি ও তার শিশুপুত্র এলার্জির সমস্যায় আক্রান্ত হলে ফকির বাজারে রিয়াজুল হকের কাছে যান। সেখানে তাদের দুজনকে দুটি করে ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। পরে ইনজেকশন নেওয়ার স্থান ফুলে যায় ও তীব্র ব্যথা শুরু হয়। পুনরায় গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভিটামিন খেলে সমস্যা সেরে যাবে বলে জানান। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হলে তারা হাত পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানান।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আশ্রাফুল ইসলামের মা মোহছেনা বেগম, ইয়াছিনের মা তাহমিনা বেগম এবং আরেক শিশুর অভিভাবক মো. হাসান। তাদের ভাষ্য, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরীক্ষায় জানা গেছে, ভুলভাবে ইনজেকশন প্রয়োগের ফলে সংক্রমণ সৃষ্টি হয়েছে। এতে হাতের স্নায়ু ও মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে হাত অকেজো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখছেন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ শোনা গেলেও অনেকে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাননি।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের পর ইউএনওর নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান পাটওয়ারী বলেন, অপচিকিৎসার ঘটনাটি জানার পর তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেছেন, যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

অভিযোগের বিষয়ে মো. রিয়াজুল হকের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইনজেকশন প্রয়োগের পর সংক্রমণের কারণে ভুক্তভোগীদের হাতের স্নায়ু ও আশপাশের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইনজেকশন দেওয়া স্থানের মাংসপেশি ক্ষয়ে যাওয়ার লক্ষণও পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, অপচিকিৎসার অভিযোগে লিখিত আবেদন পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি তদন্ত সম্পন্ন করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *