স্টাফ রিপোর্টার : পরিকল্পনা ও সরকারি বিধি উপেক্ষা করে চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি খনন করে মাছ চাষের জলাশয় তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। এতে আবাদি জমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সেচব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় ঠিক কত পরিমাণ কৃষিজমি জলাশয়ে রূপান্তর হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নির্ভুল কোনো সরকারি তথ্য সংরক্ষিত নেই।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং তুলনামূলক কম লাভের কারণে অনেকেই কৃষিকাজ থেকে সরে এসে মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ নিজের জমিতে মাছ চাষ করছেন, আবার অনেকে জমি ইজারা দিয়ে নিয়মিত আয় করছেন।
সরেজমিনে কচুয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কৃষিজমি খনন করে মাছের ঘের তৈরির চিত্র দেখা গেছে। প্রতিবছর নতুন নতুন জমি এভাবে জলাশয়ে রূপান্তর হচ্ছে। কড়ইয়া ইউনিয়নের সাদিপুরা, নেয়াগাঁও, লুনতি, গোহট ইউনিয়নের পালগিরি, হারিসাইল, মিয়ার বাজার, তালতলি, নাউলা ও আইনগিরি, গোহট দক্ষিণ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, কেশরকোর্ট, নাউপুরা এবং আশরাফপুর ইউনিয়নের রসুলপুর, মুর্তজাপুর ও জগৎপুর এলাকায় এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। একই চিত্র রয়েছে কচুয়া পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানেও।
শুধু কচুয়াই নয়, জেলা সদর, শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জ, মতলব দক্ষিণ ও ফরিদগঞ্জ উপজেলাতেও কৃষিজমি খনন করে মাছ চাষের বিস্তার ঘটছে। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের চান্দ্রা বাজারসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জমি, যেখানে একসময় ধান চাষ হতো, এখন বছরজুড়েই মাছ চাষের আওতায় রয়েছে।
কচুয়া উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, একসময় উপজেলায় কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৭৩৯ হেক্টর। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৯৫ হেক্টরে। মাছের ঘের নির্মাণ, নতুন সড়ক এবং আবাসন প্রকল্পের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে।
কড়ইয়া ইউনিয়নের লুনতি গ্রামের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম বলেন, আগে এলাকায় প্রায় সব জমিতেই ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো। এখন কয়েকজন মাছ চাষ শুরু করার পর অন্যরাও সেই পথে হাঁটছেন।
গোহট দক্ষিণ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক কবির হোসেন জানান, ধান চাষে লোকসান হওয়ায় তিনি জমি মাছ চাষের জন্য ইজারা দিয়েছেন। এতে প্রতি বছর প্রতি শতাংশ জমি থেকে প্রায় এক হাজার টাকা আয় হয়। পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকের সংকট ও উচ্চ মজুরিও কৃষিকাজে নিরুৎসাহিত করছে।
একই এলাকার ইউপি সদস্য ও মাছ চাষি বিল্লাল হোসেন বলেন, নিজের জমির পাশাপাশি ইজারা নেওয়া জমিতেও মাছ চাষ করছেন। কৃষি আবাদে প্রত্যাশিত লাভ না পাওয়ায় তিনি এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে চাঁদপুরে প্রায় ৯৪ হাজার হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। তবে মাছ চাষের জন্য কত জমির শ্রেণি পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষিত নেই।
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, মৎস্য বিভাগ নিরাপদ মাছ উৎপাদন, কারিগরি সহায়তা এবং চাষিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে অনাবাদি জলাশয় ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হলেও জমির শ্রেণি বিন্যাস নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বাপ্পি দত্ত রনি বলেন, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হয়। তদন্ত শেষে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, কৃষির পাশাপাশি মাছ চাষে আগ্রহ বাড়ায় অনেক আবাদি জমির শ্রেণি পরিবর্তন হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি কৃষিজমি সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জেলার অনেক প্রাকৃতিক জলাশয় সংস্কারের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে। নতুন করে কৃষিজমি খননের পরিবর্তে এসব জলাশয় পুনঃখনন ও সংস্কার করে মাছ চাষ সম্প্রসারণ করা হলে কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, গত মে মাসে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নতুন ভূমি আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত হয়ে বাস্তবায়িত হলে জমির শ্রেণিভিত্তিক সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং কৃষিজমি সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

