হাইমচর প্রতিনিধি : হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে শুরু হয়েছে হোগল সংগ্রহের ব্যস্ততা। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো হোগলা গাছের ফুল সংগ্রহ, শুকানো ও গুঁড়া প্রস্তুতের কাজে দিন কাটছে শতাধিক কৃষক ও সংগ্রহকারীর। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি হোগল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় এটি অনেক পরিবারের জন্য মৌসুমি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
সোমবার (২০ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির উঠান ও খোলা জায়গায় কৃষকেরা হোগলা ফুল শুকাচ্ছেন। শুকিয়ে যাওয়ার পর ফুলে আলতোভাবে আঘাত করলে সোনালি-হলুদ রঙের সূক্ষ্ম গুঁড়া বের হয়ে আসে। পরে চালুনির মাধ্যমে তা ছেঁকে বিশুদ্ধ হোগল আলাদা করা হয়। দেখতে অনেকটা ময়দা বা হলুদের গুঁড়ার মতো হলেও এর স্বাদ ও ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয় হোগলা গাছ। বর্ষার শুরুতে ফুল ফোটার পর কৃষকেরা নৌকায় করে চরাঞ্চলে গিয়ে ফুল সংগ্রহ করেন। এরপর কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হয় হোগল। এই মৌসুমি কাজ অনেকের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে।
স্থানীয়দের কাছে হোগল একটি জনপ্রিয় মৌসুমি খাদ্য। দুধ, নারকেল, চিনি কিংবা গুড় দিয়ে রান্না করলে এটি সুস্বাদু খাবারে পরিণত হয়। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে পারিবারিক বিভিন্ন আয়োজনে হোগলের তৈরি খাবার পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে। শিশু ও বয়স্ক—সব বয়সী মানুষের কাছেই এর কদর রয়েছে।
চরভৈরবী ইউনিয়নের পাড়া বগুলা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হোগল সংগ্রহ ও বিক্রিই তাদের অন্যতম আয়ের উৎস। মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে চর থেকে ফুল সংগ্রহ, শুকানো, গুঁড়া তৈরি এবং বাজারজাত—পুরো প্রক্রিয়াটি কষ্টসাধ্য হলেও ভালো দাম পাওয়ায় সেই পরিশ্রম সার্থক হয়।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভালো মানের হোগলের চাহিদা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলাতেও রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে হোগল কিনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। ফলে বর্ষা মৌসুমে এই পণ্য স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
তবে কৃষি বিভাগ পরিকল্পিতভাবে হোগলা চাষে নিরুৎসাহিত করছে। হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার বলেন, হোগলা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকদের নতুন করে হোগলার আবাদ না করে লাভজনক ও খাদ্যশস্যভিত্তিক ফসল চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, চরাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো হোগলা গাছ থেকে ফুল সংগ্রহে কৃষি বিভাগের কোনো আপত্তি নেই। তবে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে পরিকল্পিতভাবে হোগলা চাষ এড়িয়ে চলাই প্রয়োজন।
স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, হোগল শুধু একটি মৌসুমি খাদ্য নয়; এটি হাইমচরের চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই সম্পদ সংগ্রহ করে কৃষকেরা যেমন খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনেন, তেমনি বাজারজাত করে সংসারের বাড়তি আয়ও নিশ্চিত করেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

