মতলব উত্তর প্রতিনিধি : চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও নাগরিক সেবার সংকট থেকে মুক্তি পেতে একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন গঠনের দাবি তুলেছেন। মোহনপুর, এখলাশপুর ও জহিরাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলীয় চরগুলোকে একীভূত করে নতুন ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পক্ষে স্থানীয়দের মধ্যে জনমত ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন তথ্য অনুযায়ী, মেঘনার পশ্চিম পাড়ে তিনটি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সাতটি ওয়ার্ডে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। ১০টি মৌজাজুড়ে বিস্তৃত এ অঞ্চলে বাহেরচর, চর ওয়েস্টার, চরকাশিম, বোরচর, উত্তর বোরচর, দক্ষিণ বোরচর, দিয়ারা বোরচর, নাপিতমারা, নাছিরাচর এবং চর ওমেদসহ মোট আটটি গ্রাম রয়েছে।
বর্তমানে চরাঞ্চলগুলো মোহনপুর ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড, এখলাশপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং জহিরাবাদ ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাভুক্ত। তবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যালয় নদীর অপর প্রান্তে বা অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ কিংবা ওয়ারিশ সনদের মতো মৌলিক সেবা পেতেও তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা এবং শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ বালুচর অতিক্রম করে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ভোগান্তিও বাড়ছে।
চরবাসীদের দাবি, নির্বাচনের সময় তাদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ হলেও উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। ফলে এলাকার অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জীবনমান প্রত্যাশিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চরাঞ্চলে কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় জরুরি রোগী ও প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নদীপথের প্রতিকূলতা রোগীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে।
শিক্ষা খাতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও যাতায়াত সমস্যার কারণে শিক্ষক উপস্থিতি নিয়মিত থাকে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও ভৌগোলিক দূরত্ব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, চুরি, জমি দখল কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে মূল ভূখণ্ড থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে।
এখলাশপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সোহাগ দেওয়ান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় স্থানীয় সরকার সেবা পৌঁছে দিতে এবং রাস্তাঘাট, কালভার্ট, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি বরাদ্দ নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন গঠন এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের পাশাপাশি একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
চরাঞ্চলের বাসিন্দা কবির হোসেন, জাহিদ সরদার, নুরে আলম প্রধানীয়া, সানাউল্লাহ, কাদির মিঝি, জহির বেপারী, ইব্রাহীম খলিল ও আরিফ হোসেনসহ অনেকেই মনে করেন, জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার বিবেচনায় এ অঞ্চল একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উপযুক্ত। তাদের মতে, নতুন ইউনিয়ন গঠিত হলে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি এলজিইডি ও সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী চরাঞ্চলকে স্বতন্ত্র ইউনিয়নের আওতায় আনা গেলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর হবে এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, স্থানীয় জনগণের জনমত, নাগরিক সেবা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা সম্পর্কিত দাবি যথাযথভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হলে তা তদন্ত ও পর্যালোচনার মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত হলে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

