স্টাফ রিপোর্টার : পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানিয়ে চাঁদপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে আলোচনা সভা, কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা প্রতীকীভাবে পরিবেশ দূষণ, বাল্যবিবাহ ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘লালকার্ড’ প্রদর্শন করে এসব সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ‘এখনই জলবায়ু পদক্ষেপের সময়’ (Now for Climate) স্লোগানকে সামনে রেখে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), চাঁদপুর এ কর্মসূচির আয়োজন করে। সোমবার (২২ জুন) পুরানবাজার নুরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
সনাক চাঁদপুরের সভাপতি মো. আলমগীর পাটওয়ারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাছিমা বেগম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. মিজানুর রহমান বলেন, পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। পরিবেশের পাশাপাশি প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
তিনি প্লাস্টিক দূষণকে পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং জনসচেতনতার অভাবে পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা দেখলে ৩৩৩ নম্বরে কল করা অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নাছিমা বেগম বলেন, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ নির্মূলে শিক্ষার্থীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দেশে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। নারী ও শিশু নির্যাতন কিংবা বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ ব্যবহারের পরামর্শও দেন তিনি।
সনাকের সাবেক সভাপতি ও সদস্য কাজী শাহাদাত বলেন, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরী ঝরে পড়ছে এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে পড়ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রশাসন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে মো. আলমগীর পাটওয়ারী বলেন, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করার এবং বাল্যবিবাহ ও মাদককে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলার আহ্বান জানান তিনি।
টিআইবির এরিয়া কোঅর্ডিনেটর মো. মাসুদ রানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. চাঁদ মিয়া, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. তৌহিদুল ইসলাম তরুণ, প্রধান শিক্ষক মো. বুলবুল আহছান, সনাক সদস্য রফিক আহমেদ মিন্টু ও মো. হাবীবুর রহমান পাটওয়ারী, এসিজি গ্রুপের সমন্বয়কারী মো. ফজলুর রহমান রুবেল, ইয়েস গ্রুপের দলনেতা জান্নাতুল ফেরদাউস এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্পা পাল ও আপন দাস।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয় এবং কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা হলেন— দশম শ্রেণির মেহেরুন আক্তার, হাবিবা আক্তার ও মাহবুবা রহমান এবং নবম শ্রেণির জান্নাতুল মাওয়া, তাহমিনা আক্তার ও নূরনবী।
সভায় টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একাধিক সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের জন্য সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নীতিগত সহায়তা, সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর-শুল্ক হ্রাস, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা প্রদান।
এছাড়া পরিবেশ আদালত আইন সংশোধন, জলাভূমি দখল ও বন উজাড় বন্ধ, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রটোকল প্রণয়ন এবং পরিবেশ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে এ খাতে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সনাক-চাঁদপুরের সদস্য, অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপ (এসিজি), ইয়েস গ্রুপ এবং টিআইবির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

