ফরিদগঞ্জের কেরোয়া গ্রামে মাছ চাষে বদলে গেছে শত পরিবারের জীবন

ফরিদগঞ্জের কেরোয়া গ্রামে মাছ চাষে বদলে গেছে শত পরিবারের জীবন

উপজেলা সংবাদ ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্লাইড

মোঃ শাখাওয়াত হোসেন মিন্টু : চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়া নদীর তীরবর্তী কেরোয়া গ্রামে মাছ চাষ ঘিরে গড়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একসময় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকা এলাকার মানুষ এখন মাছ চাষকে জীবিকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এ খাতে সফলতা পেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন বহু পরিবার। পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান, সম্প্রসারিত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উন্নত হয়েছে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা। তবে মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য সত্ত্বেও সরকারি সহযোগিতা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ স্থানীয় চাষিদের।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কেরোয়া গ্রামে ৩৫টি বড় মাছের ঘের এবং ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টি জলাশয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। এসব জলাশয়ের মোট আয়তন প্রায় ৯০০ হেক্টর। এ খাতে প্রতিবছর বিনিয়োগ করা হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। মাছ চাষ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিন শতাধিক পরিবারের সদস্য।

মাছ চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের সহায়ক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মাছের খাদ্য বিক্রি, মাছ পরিবহনের ড্রামে পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং কমছে বেকারত্ব।

উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয়েছে কেরোয়া গ্রামে।

স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পর এখানকার মাছ সরবরাহ করা হয় চাঁদপুর, রামগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নোয়াখালী, মতলব, চাটখিল, কুমিল্লা ও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আড়তে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে গ্রামের প্রায় ১০০ জন মৎস্যচাষি সরাসরি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের অনেকেই একসময় প্রবাসে ছিলেন কিংবা ব্যবসা ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। মাছ চাষে সফলতা পাওয়ায় তাঁদের দেখে এলাকার নতুন উদ্যোক্তারাও এ পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন।

মৎস্যচাষি শামছুল আলম রিপন বলেন, কেরোয়া গ্রামের অনেক মানুষ মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি প্রবাস থেকে দেশে ফিরে এ পেশায় যুক্ত হন। মাছ চাষ করে ভালো সফলতাও পেয়েছেন।

আরেক মৎস্যচাষি আসাদুজ্জামান আরজু জানান, তিনি উপজেলার গ্রামীণফোন ও ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এলাকার চাষিদের সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনিও মাছ চাষ শুরু করেছেন।

মৎস্যচাষি কামাল মাল বলেন, ১৪ বছর আগে প্রবাস থেকে দেশে ফিরে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। তাঁর মতো এলাকার অনেক যুবক এ পেশার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

মাছ চাষে সাফল্যের পাশাপাশি নানা প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়তে হচ্ছে চাষিদের। তাঁদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে কখনো কখনো ঘেরের মাছ মারা গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা মৎস্য কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য ক্ষতিপূরণমূলক সহায়তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি তাঁদের।

এ অবস্থায় মাছ চাষের উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মৎস্যচাষিরা।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ বেলায়েত হোসেন বলেন, মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কেরোয়া গ্রাম উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। উপজেলার মাছের চাহিদা পূরণে এখানকার চাষিরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন। উপজেলায় উৎপাদিত মাছের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে এ গ্রাম থেকে।

তিনি জানান, ফরিদগঞ্জ উপজেলায় বছরে মাছের চাহিদা প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন। বিপরীতে গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। এ উৎপাদনের বড় একটি অংশ কেরোয়া গ্রামের মৎস্যচাষিদের অবদান।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয় বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *