ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি : ফরিদগঞ্জ উপজেলার একটি দাখিল মাদ্রাসায় ১২ বছর অনুপস্থিত থাকা এক শিক্ষককে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সরকারি এমপিও ইনডেক্স সচল রাখা হয় এবং পরে নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই তাকে পুনর্বহাল করা হয়। বিষয়টি জানাজানির পর প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে।
ঘটনাটি উপজেলার পূর্ব এখলাছপুর দারুল এখলাছ আমেনা (রাঃ) মহিলা দাখিল মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষক আল মামুন ২০১২ সালে একটি এমএলএ (মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর এলাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি মাদ্রাসায় অনুপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা শিক্ষা বোর্ডকে অবহিত করা হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানটির সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ তথ্য গোপন করে শিক্ষক আল মামুনের সরকারি এমপিও ইনডেক্স (C 2000896) সচল রাখেন।
আরও অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একটি সাধারণ সাদা কাগজে আবেদন জমা দেওয়ার পর আল মামুনকে আবারও একই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই প্রক্রিয়া বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ এর ১৮ ধারার ১(গ) উপধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই নীতিমালায় মিথ্যা তথ্য প্রদান বা অধিদপ্তর ও বোর্ডের নির্দেশ অমান্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমপিও বাতিল এবং ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
দীর্ঘ ১২ বছর অনুপস্থিত থাকার কারণ জানতে চাইলে শিক্ষক আল মামুন দাবি করেন, রাজনৈতিক কারণে তিনি এলাকায় থাকতে পারেননি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলার তথ্য জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক কারণে নয়; বরং প্রতারণার অভিযোগের পর তিনি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষ এখনো তাঁর খোঁজ করছেন।
১২ বছর অনুপস্থিত থাকার পর কোন বিধি বা রেজুলেশনের ভিত্তিতে শিক্ষককে পুনর্বহাল করা হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার সুপার ইকরাম হোসেন হামিদ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে আল মামুন একটি সাদা কাগজে আবেদন দিলে তিনি তাতে সম্মতি দেন এবং পরবর্তীতে বেতন বিলেও স্বাক্ষর করেন।
এত দীর্ঘ সময় অনুপস্থিতির পর কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে কেন জানানো হয়নি—এমন প্রশ্নে সুপার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন। কখনও তিনি বলেন, বিষয়টি মনে নেই; আবার কখনও দাবি করেন, মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ জনতা ব্যাংক (পিএলসি) শাখার ব্যবস্থাপক কে.এম. ফখরুল ইসলাম বলেন, এমপিও ইনডেক্স সচল থাকলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের পাঠানো বিল ব্যাংক পরিশোধ করে। তবে এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পক্ষ থেকেও আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল এবং চাঁদপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল্লা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, ১২ বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার পরও একজন শিক্ষক কীভাবে বহাল ছিলেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক। তিনি জানান, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে জালিয়াতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

