মতলব উত্তর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ বছর ধরে বন্ধ সিজারিয়ান

মতলব উত্তর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ বছর ধরে বন্ধ সিজারিয়ান

উপজেলা সংবাদ মতলব উত্তর উপজেলা স্লাইড

জাহাঙ্গীর আলম প্রধান : মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। গাইনি, সার্জারি ও অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল। ফলে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে প্রসূতি মায়েদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।

চরাঞ্চলসমৃদ্ধ মতলব উত্তর উপজেলার দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা এই সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২১টি। কাগজে পাঁচটি পদ শূন্য দেখানো হলেও বাস্তবে চিকিৎসক নেই সাতটি পদে। শূন্য পদগুলোর মধ্যে রয়েছে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেশিয়া), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন), ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার, ডেন্টাল সার্জন ও সার্জন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে কখনো গাইনি চিকিৎসক থাকলেও সার্জারি কিংবা অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ থাকেন না। আবার সার্জন থাকলেও গাইনি চিকিৎসকের অভাব দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় তিন বিভাগের চিকিৎসক একসঙ্গে না থাকায় অপারেশন থিয়েটার চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সিজারিয়ানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারও বন্ধ রয়েছে।

২০০৮ সালে উপজেলার মরাদোন এলাকায় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় মানুষের চাহিদা বিবেচনায় হাসপাতালটির ৫০ শয্যার অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও এখনো ৫০ শয্যার কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন মেলেনি।

হাসপাতালে কাগজে-কলমে একজন গাইনি চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। তবে তিনি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ডেপুটেশনে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বাস্তবে গাইনি চিকিৎসক ছাড়াই চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম।

এদিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এতে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। চিকিৎসক ও সরঞ্জামের সংকটে বিশেষ করে গ্রামীণ এবং চরাঞ্চলের মানুষকে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশের একটি ফার্মেসির কর্মী জানান, অনেকেই না জেনে প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান কিংবা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য এ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। স্থানীয় সড়ক যোগাযোগের দুরবস্থার কারণে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে গিয়ে প্রসূতি ও তাঁদের স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

ইসলামাবাদ এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আমার বোনের বাচ্চা হবে। প্রসববেদনায় ছটফট শুরু করলে অনেক কষ্ট করে তাকে সরকারি এই হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু এখানে কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানানো হয়। পরে ছেংগারচর বাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করাতে হয়েছে।’

উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘চরাঞ্চলসমৃদ্ধ এই উপজেলার অসংখ্য অসচেতন প্রসূতি মা এখনো সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ধাত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সেখানে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসার সরকারি হাসপাতালে ১৮ বছরের মধ্যে ১৫ বছর গাইনি চিকিৎসা ও সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।’

অপারেশন থিয়েটার দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাশ বলেন, ‘এখানকার গাইনি চিকিৎসক ডেপুটেশনে অন্যত্র চলে যাওয়ায় আমরা শূন্য পদটিও দেখাতে পারছি না। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় এ উপজেলার প্রসূতি মায়েরা এই হাসপাতাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *