মহাজন নির্ভরতা ও কমিশন প্রথায় টিকে থাকা নিয়ে সংকটে চাঁদপুরের জেলে সম্প্রদায়

মহাজন নির্ভরতা ও কমিশন প্রথায় টিকে থাকা নিয়ে সংকটে চাঁদপুরের জেলে সম্প্রদায়

উপজেলা সংবাদ চাঁদপুর সদর মতলব উত্তর উপজেলা স্লাইড হাইমচর উপজেলা

মহাজন নির্ভরতা ও কমিশন প্রথায় টিকে থাকা নিয়ে সংকটে চাঁদপুরের জেলে সম্প্রদায়

মহাজন নির্ভরতা ও কমিশন প্রথায় টিকে থাকা নিয়ে সংকটে চাঁদপুরের জেলে সম্প্রদায়স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদপুরের পদ্মা–মেঘনা নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় জীবিকা নির্বাহে চরম সংকটে পড়েছেন স্থানীয় জেলেরা। আয় কমলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাদনের (মহাজনি ঋণ) ওপর নির্ভরতা কমাতে পারছেন না তারা। এমনকি দাদন না নিলেও মাছ বিক্রির সময় আড়তে ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত কমিশন দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলেরা।
চাঁদপুর সদর উপজেলার আনন্দ বাজার, দোকানঘর, সাখুয়া ও বহরিয়া এলাকার জেলে ও মহাজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত ২৫-৩০ বছরে দাদনের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। আগে যেখানে ৫০০ টাকা দাদন নিয়ে মাছ ধরার কাজ শুরু হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত।
সদরের সাখুয়া গ্রামের জেলে ওসমান ঢালী জানান, প্রায় তিন দশক আগে তিনি নৌকা প্রস্তুতের জন্য ৫০০ টাকা দাদন নিয়েছিলেন। বর্তমানে একই কাজে তার ঋণ অর্ধলাখ টাকায় পৌঁছেছে। তার ভাষায়, আগে দুটি নৌকা থাকলেও এখন একটি নৌকা নিয়েই মাছ ধরতে হয়।
তিনি আরও জানান, দাদন না নিলেও আড়তে মাছ বিক্রির সময় মহাজনদের ১০% কমিশন দিতে হয়, যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
একই এলাকার একাধিক জেলেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অনেকেই আবার এনজিও ঋণ নিয়ে নৌকা ও জাল তৈরি করেন, যা মাছ বিক্রির আয় থেকে পরিশোধ করতে হয়।
চাঁদপুরের পদ্মা–মেঘনা ও সাগর এলাকায় মাছ ধরেন মো. হানু গাজী (৩৬)। তিনি জানান, তার দুটি নৌকায় ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন এবং তিনি চারজন মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়েছেন।
তার মতে, শুধু চাঁদপুর নয়—হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট ও বরিশালের ঘাট থেকেও দাদন নিতে হয়। সাগর এলাকায় মাছ ধরতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনুমতি ও পতাকা ছাড়া মাছ ধরা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও তিনি জানান।
হানু গাজী বলেন, ইলিশ কমে যাওয়ায় আয় কমেছে। অন্যদিকে কারেন্ট জাল ব্যবহারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও জামিন ব্যয় সব মিলিয়ে দাদনের পরিমাণ আরও বাড়ছে। অনেক সময় মহাজরাই জামিনের খরচ বহন করেন, পরে তা আবার নতুন ঋণ হিসেবে যোগ হয়।
লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া ইলিশ আড়তে বর্তমানে পাঁচজন মহাজন সক্রিয় রয়েছেন। তাদের মধ্যে সোলেমান মাঝি প্রায় দুই শতাধিক জেলেকে দাদন দিয়েছেন।
মহাজন বিল্লাল মাঝি জানান, সাধারণত জেলেরা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নেয় এবং এর বিনিময়ে মাছ বিক্রির ওপর ৫% কমিশন দিতে হয়। একইসঙ্গে শ্রমিকদের অন্য নৌকায় চলে যাওয়া ঠেকাতে জেলে পর্যায়ে দাদন ব্যবস্থা চালু রাখা হয়।
সোলেমান মাঝির ব্যবসা পরিচালনাকারী তার ছেলে মো. রাব্বি বলেন, জেলেরা সাধারণত যেখান থেকে দাদন নেয়, সেখানেই মাছ বিক্রি করে। তবে কাউকে বাধ্য করা হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক জানান, জেলায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির জন্য মৎস্য বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তার মতে, জেলেরা যদি বিকল্প পেশায় যুক্ত না হন, তাহলে দাদন ও ঋণের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *